সচেতনতা সভা, নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধে নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনে ঐক্যবদ্ধ
সচেতনতা সভা, নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধে নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনে ঐক্যবদ্ধ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের RASFF সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে চিংড়িতে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার প্রতিরোধ ও নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদন নিশ্চিত করতে আজ সোমবার সকাল ১০ ঘটিকায় দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া বাজারে আহসানিয়া ফিশ ডিপো প্রাঙ্গণে “গুড অ্যাকুয়াকালচার প্র্যাকটিস (GAP) বিষয়ক সচেতনতা সভা” অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে উপজেলা মৎস্য দপ্তর, দেবহাটা, মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (FIQC), খুলনা, এবং ইন্টারন্যাশনাল শ্রিম্প এক্সপোর্টারস (প্রা:) লি., খুলনা।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ তৌফিকুল ইসলাম, সিনিয়র সহকারী পরিচালক, জেলা মৎস্য দপ্তর, সাতক্ষীরা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এ. বি. এম. জাকারিয়া, মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, FIQC খুলনা, এবং মোঃ মাসুদুর রহমান, পরিদর্শক, FIQC খুলনা। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জনাব মোঃ আবুবকর সিদ্দিক, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার, দেবহাটা, সাতক্ষীরা। সভায় বক্তারা বলেন, “ম্যালাকাইট গ্রিনসহ নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে শূন্য সহনীয় (Zero Tolerance)। এর উপস্থিতি চিংড়ির মান নষ্ট করে, দেশের রপ্তানি বাজারের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।”
আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশে চিংড়ি চাষে নিম্নলিখিত রাসায়নিক পদার্থসমূহ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও শূন্য সহনীয় (Zero Tolerance): ম্যালাকাইট গ্রিন (Malachite Green) ও লিউকো-ম্যালাকাইট গ্রিন (Leuco-Malachite Green), নাইট্রোফিউরান (Nitrofuran) ও এর ডেরিভেটিভ যেমন ফুরাজোলিডোন (Furazolidone) ও নাইট্রোফিউরাজোন (Nitrofurazone), ক্লোরামফেনিকল (Chloramphenicol), মেট্রোনিডাজল (Metronidazole), ক্রিস্টাল ভায়োলেট (Crystal Violet) এবং জেন্টিয়ান ভায়োলেট (Gentian Violet)। এইসব রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে ক্যান্সার, লিভার ও কিডনি জটিলতা সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই চাষি, ফিড ব্যবসায়ী ও ডিপো মালিকদের এইসব উপাদান ব্যবহারে সম্পূর্ণ বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। সভায় বক্তারা আরও বলেন, “নিরাপদ চিংড়ি শুধু রপ্তানি বাজারেই নয়, দেশীয় ভোক্তার জন্যও অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় চাষি, আড়তদার, ফিড ও ইনপুট ব্যবসায়ী এবং প্রসেসিং কারখানার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চাষিদের মাঝে তথ্যপত্র ও সচেতনতা লিফলেট বিতরণ করা হয়।
সভায় আলোচনায় বক্তারা বলেন, নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। প্রথমত, চাষ পর্যায়ে অনুমোদিত ইনপুট, প্রোবায়োটিক ও ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিতভাবে ঘেরের পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করতে হবে এবং সঠিক গভীরতা বজায় রাখতে হবে। ঘেরের ইতিহাস, খাদ্য, ওষুধ প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে রেকর্ড রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ট্রেসেবিলিটি বা উৎস নির্ণয়ে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, সংগ্রহ ও বিপণন পর্যায়ে চিংড়ি সংগ্রহের সময় উৎস যাচাই করতে হবে এবং ডিপো বা আড়তে আসার পর মান পরীক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। বরফ ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত পানি যেন বিশুদ্ধ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রসেসিং পর্যায়ে HACCP নীতিমালা অনুযায়ী মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে এবং রপ্তানির আগে রেসিডিউ বা অবশিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো নিষিদ্ধ ইনপুট শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সবশেষে, সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং ও রেসিডিউ স্যাম্পল সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা, এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা বলেন, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সততা, সচেতনতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত চিংড়ি ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ধরে রাখতে পারবে।
















