রাজশাহীতে ভুয়া পাইলট পরিচয়ে প্রেম ও বিয়ে নারী প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার মারুফ ওরফে অধি
তন্ময় দেবনাথ, রাজশাহী থেকে:
রাজশাহীতে ভুয়া পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, বিয়ে করা, অর্থ আত্মসাৎ এবং স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মারুফ ওরফে অধিকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে ধারাবাহিক প্রতারণার চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি পরিচয়, পেশা ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতিকে হাতিয়ার বানিয়ে নারীদের বিশ্বাস অর্জন করতেন, পরে আর্থিক সুবিধা নিতেন এবং সম্পর্ক ভেঙে যেতেই শুরু হতো নির্যাতন বা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধি রাজশাহী নগরীর উত্তরা ক্লিনিক মোড় এলাকায় বসবাস করতেন এবং নিজেকে কখনও পাইলট, কখনও বিদেশি প্রশিক্ষক কিংবা আন্তর্জাতিক এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিতেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে তোলা ছবি, বিমান সংক্রান্ত পোস্ট এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সাজানো বর্ণনা দেখে অনেকেই তাকে বিশ্বাস করতেন। তদন্তকারীরা বলছেন, এই ডিজিটাল ইমেজ তৈরিই ছিল তার প্রতারণার প্রধান কৌশল।
ভুক্তভোগী প্রথম স্ত্রীর অভিযোগে উঠে এসেছে নির্যাতনের বিস্তারিত চিত্র। তিনি জানান, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই অধি নানা অজুহাতে টাকা চাইতে শুরু করেন। কখনও বিদেশ যাওয়ার খরচ, কখনও প্রশিক্ষণ ফি, কখনও ব্যবসার বিনিয়োগ—এইসব কারণে কয়েক দফায় বড় অঙ্কের টাকা নেন। টাকা দিতে দেরি হলে শুরু হতো মারধর, অপমান এবং মানসিক চাপ। তার ভাষায়, “সে আমাকে ভালোবাসেনি, বরং টাকার উৎস হিসেবে দেখেছে।”
এক নারী, যিনি নিজেকে অধির সাবেক প্রেমিকা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, বলেন তিনি দীর্ঘদিন ধরে অধির সঙ্গে ভবিষ্যৎ বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সম্পর্ক চালিয়ে যান। অধি তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন এবং প্রশিক্ষণের নামে অর্থ নেন। পরে জানতে পারেন, অধির আগেই সংসার রয়েছে। তিনি বলেন, “তার কথাবার্তা, পোশাক, জীবনযাপন-সবই এমন ছিল যেন সত্যিই আন্তর্জাতিক পেশাজীবী। পরে বুঝলাম সব সাজানো।”
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস আগে তার একাধিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এক নারী প্রকাশ্যে তাকে অপমান করে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সেই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং একে একে সামনে আসতে থাকে প্রতারণার অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রথম স্ত্রীকে তালাক না দিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরে প্রথম স্ত্রীকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পক্ষের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, বিয়ের সময় তাদের কাছে নিজের বৈবাহিক অবস্থা গোপন করেছিলেন অধি। পরে সত্য প্রকাশ পেলে পরিবারটি প্রতারণার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করে।
ঘটনার সূত্র ধরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভদ্রা আবাসিক এলাকার ৫নং রোডের “নিসুস মেকওভার” নামক একটি বিউটি পারলার থেকে তাকে আটক করে মান্দা থানা পুলিশ। অভিযানে সহযোগিতা করে নগরীর চন্দ্রীমা থানা। মামলায় অধির পিতা-মাতাসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে অধি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেন, আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পর যোগাযোগ কমিয়ে দিতেন অথবা নির্যাতনের পথ বেছে নিতেন। আরও ভুক্তভোগী সামনে এলে মামলায় নতুন ধারা যুক্ত হতে পারে।
এই ঘটনার পর নগরজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো পরিচয়, দ্রুত সম্পর্ক গড়া এবং যাচাই ছাড়া আর্থিক লেনদেন-এই তিনটি বিষয় এখন প্রতারণার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফলে সম্পর্ক বা বিয়ের আগে পারিবারিক যাচাই, পেশাগত প্রমাণ এবং আইনগত নিশ্চিতকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ বিয়ে করা স্ত্রীর ও অতিত,অধির একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, নতুন তথ্য, ভুক্তভোগীর বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।

























