১১:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় খুলনার ডুমুরিয়া চিংড়ি ও মাছ চাষিদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে যশোরের শার্শায় সফল পাবদা চাষ পরিদর্শন

শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া খুলনা প্রতিনিধি:
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া খুলনা প্রতিনিধি:

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় খুলনার ডুমুরিয়া চিংড়ি ও মাছ চাষিদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে যশোরের শার্শায় সফল পাবদা চাষ পরিদর্শন

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বাস্তব জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাছ ও চিংড়ি চাষিদের নিয়ে যশোর জেলার শার্শা উপজেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন এই জলবায়ু সহনশীল মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ডুমুরিয়া উপজেলার মোট ৫০ জন মাছ চাষি যশোর জেলার শার্শা উপজেলার পুটখালী ইউনিয়নের বারোপোতা এলাকায় অবস্থিত সাড়ে চারশ বিঘা আয়তনের একটি সফল পাবদা মাছ চাষ প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক ও লাভজনক পাবদা মাছ চাষ পদ্ধতি, উন্নত পুকুর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং জলবায়ু সহনশীল মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সম্পর্কে সফল চাষিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা।

সফরকারী চাষিদের শার্শা উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা। ডুমুরিয়া উপজেলার পক্ষ থেকে এই সফরের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্ষেত্র সহকারী কে. এম. মহসিন আলম, মৎস্য দপ্তরের মাঠকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।

পরিদর্শনকালে চাষিরা বারোপোতা এলাকার একটি সফল পাবদা চাষ প্রকল্প ঘুরে দেখেন, যা বর্তমানে পাবদা মাছ চাষের একটি আদর্শ মডেল হিসেবে পরিচিত। প্রকল্পের মালিক ও সফল পাবদা চাষি মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস চাষিদের সামনে সরেজমিনে জাল টেনে পাবদা ও সাদা মাছ প্রদর্শন করেন। উপস্থিত চাষি ও কর্মকর্তারা মাছের স্বাস্থ্য, বৃদ্ধির হার ও উৎপাদনের মান দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পরিদর্শনে জানা যায়, চাষি কুদ্দুস বিশ্বাস প্রায় ৩০টি পুকুরে মোট সাড়ে চারশ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পাবদা মাছ চাষ করছেন। তিনি পাবদার পাশাপাশি পলিকালচার পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছ চাষ করে থাকেন। শতক প্রতি পাবদার মজুদ ঘনত্ব প্রায় ৭৫০টি এবং সাদা মাছের মজুদ ঘনত্ব শতক প্রতি প্রায় ৮টি। পুকুরে পানির গভীরতা ৫ ফুট থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তিনি প্রায় ২৫০০ লাইনের পাবদা পোনা ৭ থেকে ৯ মাস চাষ করে বাজারজাত করেন এবং শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, পাবদা মাছ রপ্তানিও করে থাকেন।

অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে সফল পাবদা চাষি কুদ্দুস বিশ্বাস তার বাস্তব চাষ অভিজ্ঞতা, পোনা ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রয়োগ কৌশল, রোগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, বাজার সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। এ সময় ডুমুরিয়া ও শার্শা উপজেলার চাষিদের মধ্যে এক প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।

এই অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় মৎস্য পরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ডুমুরিয়ার চাষীদের পাবদা চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং যেকোন সমস্যায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এ প্রোগ্রামে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামান, যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন, শার্শা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা, বেনাপোল স্থলবন্দরের কোয়ারেন্টাইন অফিসার সজীব সাহা এবং প্রকল্প উদ্যোক্তা মেসার্স জনতা ফিসের প্রোপাইটর মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস।

ডুমুরিয়া উপজেলার চাষিদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে অংশ নেন শেখ মাহতাব হোসেন, মারুফ সরদার, কনিকা মন্ডল, রাজু, আবু বকর, বিশ্বজিৎ, তৌফিক সরদার ও বিল্লাল সরদার প্রমুখ।

আলোচনায় ডুমুরিয়ার চাষিরা বলেন, এই সফরের মাধ্যমে তারা আধুনিক পাবদা মাছ চাষ প্রযুক্তি, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং নিয়মিত পরিচর্যার গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করেছেন। ভবিষ্যতে তারা নিজ নিজ পুকুরে পাবদা মাছ চাষ শুরু করতে আগ্রহী।

ডুমুরিয়া উপজেলার অংশগ্রহণকারী চাষিরা আরো জানান, এই ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং চিংড়ির পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে লাভজনক পাবদা মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা মৎস্য অধিদপ্তরের নিকট ভবিষ্যতে আরও প্রশিক্ষণ, বিনিময় সফর ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ভিত্তিক কার্যক্রম জলবায়ু সহনশীল ও ব্যবসায়িকভাবে টেকসই মৎস্য চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে দেশের চিংড়ির পাশাপাশি পাবদা মাছ চাষকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৯:৫৪:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
১২

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় খুলনার ডুমুরিয়া চিংড়ি ও মাছ চাষিদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে যশোরের শার্শায় সফল পাবদা চাষ পরিদর্শন

আপডেট: ০৯:৫৪:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় খুলনার ডুমুরিয়া চিংড়ি ও মাছ চাষিদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে যশোরের শার্শায় সফল পাবদা চাষ পরিদর্শন

কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বাস্তব জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাছ ও চিংড়ি চাষিদের নিয়ে যশোর জেলার শার্শা উপজেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন এই জলবায়ু সহনশীল মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ডুমুরিয়া উপজেলার মোট ৫০ জন মাছ চাষি যশোর জেলার শার্শা উপজেলার পুটখালী ইউনিয়নের বারোপোতা এলাকায় অবস্থিত সাড়ে চারশ বিঘা আয়তনের একটি সফল পাবদা মাছ চাষ প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক ও লাভজনক পাবদা মাছ চাষ পদ্ধতি, উন্নত পুকুর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং জলবায়ু সহনশীল মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সম্পর্কে সফল চাষিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা।

সফরকারী চাষিদের শার্শা উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা। ডুমুরিয়া উপজেলার পক্ষ থেকে এই সফরের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্ষেত্র সহকারী কে. এম. মহসিন আলম, মৎস্য দপ্তরের মাঠকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।

পরিদর্শনকালে চাষিরা বারোপোতা এলাকার একটি সফল পাবদা চাষ প্রকল্প ঘুরে দেখেন, যা বর্তমানে পাবদা মাছ চাষের একটি আদর্শ মডেল হিসেবে পরিচিত। প্রকল্পের মালিক ও সফল পাবদা চাষি মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস চাষিদের সামনে সরেজমিনে জাল টেনে পাবদা ও সাদা মাছ প্রদর্শন করেন। উপস্থিত চাষি ও কর্মকর্তারা মাছের স্বাস্থ্য, বৃদ্ধির হার ও উৎপাদনের মান দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পরিদর্শনে জানা যায়, চাষি কুদ্দুস বিশ্বাস প্রায় ৩০টি পুকুরে মোট সাড়ে চারশ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পাবদা মাছ চাষ করছেন। তিনি পাবদার পাশাপাশি পলিকালচার পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছ চাষ করে থাকেন। শতক প্রতি পাবদার মজুদ ঘনত্ব প্রায় ৭৫০টি এবং সাদা মাছের মজুদ ঘনত্ব শতক প্রতি প্রায় ৮টি। পুকুরে পানির গভীরতা ৫ ফুট থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তিনি প্রায় ২৫০০ লাইনের পাবদা পোনা ৭ থেকে ৯ মাস চাষ করে বাজারজাত করেন এবং শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, পাবদা মাছ রপ্তানিও করে থাকেন।

অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে সফল পাবদা চাষি কুদ্দুস বিশ্বাস তার বাস্তব চাষ অভিজ্ঞতা, পোনা ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রয়োগ কৌশল, রোগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, বাজার সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। এ সময় ডুমুরিয়া ও শার্শা উপজেলার চাষিদের মধ্যে এক প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।

এই অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় মৎস্য পরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ডুমুরিয়ার চাষীদের পাবদা চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং যেকোন সমস্যায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এ প্রোগ্রামে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামান, যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন, শার্শা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা, বেনাপোল স্থলবন্দরের কোয়ারেন্টাইন অফিসার সজীব সাহা এবং প্রকল্প উদ্যোক্তা মেসার্স জনতা ফিসের প্রোপাইটর মোঃ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস।

ডুমুরিয়া উপজেলার চাষিদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে অংশ নেন শেখ মাহতাব হোসেন, মারুফ সরদার, কনিকা মন্ডল, রাজু, আবু বকর, বিশ্বজিৎ, তৌফিক সরদার ও বিল্লাল সরদার প্রমুখ।

আলোচনায় ডুমুরিয়ার চাষিরা বলেন, এই সফরের মাধ্যমে তারা আধুনিক পাবদা মাছ চাষ প্রযুক্তি, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং নিয়মিত পরিচর্যার গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করেছেন। ভবিষ্যতে তারা নিজ নিজ পুকুরে পাবদা মাছ চাষ শুরু করতে আগ্রহী।

ডুমুরিয়া উপজেলার অংশগ্রহণকারী চাষিরা আরো জানান, এই ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং চিংড়ির পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে লাভজনক পাবদা মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা মৎস্য অধিদপ্তরের নিকট ভবিষ্যতে আরও প্রশিক্ষণ, বিনিময় সফর ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ভিত্তিক কার্যক্রম জলবায়ু সহনশীল ও ব্যবসায়িকভাবে টেকসই মৎস্য চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে দেশের চিংড়ির পাশাপাশি পাবদা মাছ চাষকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।