০৭:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটের দ্বারপ্রান্তে দেশ: ১২ ফেব্রুয়ারি কি গণতন্ত্রের রক্ষা, নাকি বিপদের ঘনঘটা?

আওরঙ্গজেব কামাল , বিশেষ প্রতিনিধি
আওরঙ্গজেব কামাল , বিশেষ প্রতিনিধি

ভোটের দ্বারপ্রান্তে দেশ: ১২ ফেব্রুয়ারি কি গণতন্ত্রের রক্ষা, নাকি বিপদের ঘনঘটা?

আসছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই একটি তারিখ ঘিরেই আজ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের বৈঠকখানা—সর্বত্র এক প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে: নির্বাচন আদৌ হবে তো? নাকি সামনে অপেক্ষা করছে কোনো অশুভ সংকেত? দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জয়ী হতে জোট গঠন করেছে। তবে একই সঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে আনছে একের পর এক অভিযোগ।

বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বারবার বলছে—সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবুও বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে জনমনের সংশয় কাটছে না।

অতীতের নির্বাচনের সহিংসতার রক্তাক্ত স্মৃতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিগত দিনের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সহিংসতার লাশের সারি। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময় যেন সংঘাতের এক চেনা অধ্যায়। প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা কতটা কার্যকর?

Human Rights Support Society (HRSS)–এর তথ্য অনুযায়ী,গত একতরফা ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তার প্রাক–পরবর্তী সময়ে প্রায় ৭৮১টি সহিংস ঘটনা ঘটে,নিহত হন অন্তত ৪৩ জন,আহত হন প্রায় ২,৫৩৮ জন,এবং বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৮২০টি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এছাড়া, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকালে কমপক্ষে ১৭ জন নিহত,২,৫০০-এর বেশি আহত,এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।এর আগের নির্বাচনগুলোর চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে কমপক্ষে ১৮ জন নিহত,১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রাণ হারান ১৪১ জন।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে সামগ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১০২ জন নিহত এবং ৪,৭৪৪ জন আহত হন—যদিও এটি কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, তবু রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। ফলে নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে বড় পরীক্ষা সামনে অপেক্ষমান।

গণতন্ত্র কেবল একটি সাংবিধানিক শব্দ নয়—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার প্রধানতম প্রকাশ নির্বাচন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অর্থে ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই একদিকে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে, অন্যদিকে অনুষ্ঠিত হবে একটি গণভোট।

সরকারের ভাষ্যমতে, এই দিন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন রূপরেখা তৈরি করা হবে। সরকারি প্রচারণায় স্পষ্ট বার্তা—দলীয় ভোট যেদিকেই যাক, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটই হওয়া উচিত। সরকারের যুক্তি, ‘না’ ভোট জয়ী হলে স্বৈরাচার ও পুরোনো জটিলতা ফিরে আসতে পারে। তবে এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ভিন্ন সুর—১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে না, এমন প্রচারণা জনমনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। এছাড়া আইনি চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তা উদ্বেগজনক।

এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান নির্বাচন স্থগিত চেয়ে একটি রিট আবেদন করেছেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয় থেকে লুট হওয়া ৫,৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।উদ্বেগজনক হলো—সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি।

ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরীফ উসমান হাদী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা। স্বেচ্ছাসেবক দলের মুসাব্বিরের নিয়াতের ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে—অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচন রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে। তবে এখন  প্রশ্ন প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা কতটুকু তৎপর নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক প্রস্তুতির কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্রভিত্তিক অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং আচরণবিধি কার্যকরের সক্ষমতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এমন অভিযোগ নির্বাচনী অংশগ্রহণকারী কিছু প্রার্থীদের। 

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো—সকল রাজনৈতিক দলের অবাধ ও নির্ভীক অংশগ্রহণ। অথচ পারস্পরিক অনাস্থা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং সংলাপের অভাব প্রকট। বর্তমান প্রেক্ষাপট সরকারের অবস্থান ও ডিজিটাল হুমকি হয়তো কিছুটা জন বলে ভয়ের সৃষ্টি করছে। কিন্তু আসার বিষয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় অবস্থান জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন—“কে কী বললো তাতে কিছু আসে-যায় না।

১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।”একই সুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশি প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন—নির্বাচন হবে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ।

তবে আজকের যুগে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল মাঠের সহিংসতা নয়; এটি ঢুকে পড়ছে স্মার্টফোনের পর্দায়—এআই-তৈরি ভিডিও, ভুয়া ঘোষণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মাধ্যমে। ফলে ‘দেখা মানেই বিশ্বাস’—এই ধারণা ভাঙতে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। আমি বলি করি সব মিলিয়ে মাঠে নির্বাচনী পরিবেশ দৃশ্যমান।

প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। অনেক জায়গায় নির্বাচন জমে উঠেছে। দিন যতই গড়াচ্ছে তত নির্বাচনের গাড়ি তার গন্তব্যে অগ্রসর হচ্ছে।তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—তাহলে কেন এত সন্দেহ, কেন এত আশঙ্কা?আমার বিশ্বাস, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক কঠিন পরীক্ষা। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, আর আস্থার সংকট থাকলে তা দূর করতে হবে সংলাপ ও সহনশীলতার মাধ্যমে। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে দ্রুততার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব
ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ১১:২৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
২৮

ভোটের দ্বারপ্রান্তে দেশ: ১২ ফেব্রুয়ারি কি গণতন্ত্রের রক্ষা, নাকি বিপদের ঘনঘটা?

আপডেট: ১১:২৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

ভোটের দ্বারপ্রান্তে দেশ: ১২ ফেব্রুয়ারি কি গণতন্ত্রের রক্ষা, নাকি বিপদের ঘনঘটা?

আসছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই একটি তারিখ ঘিরেই আজ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের বৈঠকখানা—সর্বত্র এক প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে: নির্বাচন আদৌ হবে তো? নাকি সামনে অপেক্ষা করছে কোনো অশুভ সংকেত? দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জয়ী হতে জোট গঠন করেছে। তবে একই সঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে আনছে একের পর এক অভিযোগ।

বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বারবার বলছে—সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবুও বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে জনমনের সংশয় কাটছে না।

অতীতের নির্বাচনের সহিংসতার রক্তাক্ত স্মৃতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিগত দিনের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সহিংসতার লাশের সারি। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময় যেন সংঘাতের এক চেনা অধ্যায়। প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা কতটা কার্যকর?

Human Rights Support Society (HRSS)–এর তথ্য অনুযায়ী,গত একতরফা ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তার প্রাক–পরবর্তী সময়ে প্রায় ৭৮১টি সহিংস ঘটনা ঘটে,নিহত হন অন্তত ৪৩ জন,আহত হন প্রায় ২,৫৩৮ জন,এবং বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৮২০টি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এছাড়া, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকালে কমপক্ষে ১৭ জন নিহত,২,৫০০-এর বেশি আহত,এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।এর আগের নির্বাচনগুলোর চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে কমপক্ষে ১৮ জন নিহত,১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রাণ হারান ১৪১ জন।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে সামগ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১০২ জন নিহত এবং ৪,৭৪৪ জন আহত হন—যদিও এটি কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, তবু রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। ফলে নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে বড় পরীক্ষা সামনে অপেক্ষমান।

গণতন্ত্র কেবল একটি সাংবিধানিক শব্দ নয়—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার প্রধানতম প্রকাশ নির্বাচন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অর্থে ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই একদিকে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে, অন্যদিকে অনুষ্ঠিত হবে একটি গণভোট।

সরকারের ভাষ্যমতে, এই দিন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন রূপরেখা তৈরি করা হবে। সরকারি প্রচারণায় স্পষ্ট বার্তা—দলীয় ভোট যেদিকেই যাক, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটই হওয়া উচিত। সরকারের যুক্তি, ‘না’ ভোট জয়ী হলে স্বৈরাচার ও পুরোনো জটিলতা ফিরে আসতে পারে। তবে এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ভিন্ন সুর—১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে না, এমন প্রচারণা জনমনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। এছাড়া আইনি চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তা উদ্বেগজনক।

এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান নির্বাচন স্থগিত চেয়ে একটি রিট আবেদন করেছেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয় থেকে লুট হওয়া ৫,৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।উদ্বেগজনক হলো—সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি।

ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরীফ উসমান হাদী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা। স্বেচ্ছাসেবক দলের মুসাব্বিরের নিয়াতের ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে—অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচন রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে। তবে এখন  প্রশ্ন প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা কতটুকু তৎপর নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক প্রস্তুতির কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্রভিত্তিক অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং আচরণবিধি কার্যকরের সক্ষমতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এমন অভিযোগ নির্বাচনী অংশগ্রহণকারী কিছু প্রার্থীদের। 

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো—সকল রাজনৈতিক দলের অবাধ ও নির্ভীক অংশগ্রহণ। অথচ পারস্পরিক অনাস্থা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং সংলাপের অভাব প্রকট। বর্তমান প্রেক্ষাপট সরকারের অবস্থান ও ডিজিটাল হুমকি হয়তো কিছুটা জন বলে ভয়ের সৃষ্টি করছে। কিন্তু আসার বিষয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় অবস্থান জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন—“কে কী বললো তাতে কিছু আসে-যায় না।

১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।”একই সুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশি প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন—নির্বাচন হবে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ।

তবে আজকের যুগে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল মাঠের সহিংসতা নয়; এটি ঢুকে পড়ছে স্মার্টফোনের পর্দায়—এআই-তৈরি ভিডিও, ভুয়া ঘোষণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মাধ্যমে। ফলে ‘দেখা মানেই বিশ্বাস’—এই ধারণা ভাঙতে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। আমি বলি করি সব মিলিয়ে মাঠে নির্বাচনী পরিবেশ দৃশ্যমান।

প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। অনেক জায়গায় নির্বাচন জমে উঠেছে। দিন যতই গড়াচ্ছে তত নির্বাচনের গাড়ি তার গন্তব্যে অগ্রসর হচ্ছে।তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—তাহলে কেন এত সন্দেহ, কেন এত আশঙ্কা?আমার বিশ্বাস, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক কঠিন পরীক্ষা। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, আর আস্থার সংকট থাকলে তা দূর করতে হবে সংলাপ ও সহনশীলতার মাধ্যমে। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে দ্রুততার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব
ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব