০৭:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

জাতিসংঘের মহাসচিব পদে হঠাৎ আলোচনায় লানা নুসেইবেহ

ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লানা নুসেইবেহ। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হওয়ার কথা। তবে উত্তরসূরি নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমর্থন নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে প্রতিযোগিতা জটিল হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে নুসেইবেহর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা।

প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে। কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুসেইবেহর সমর্থকেরা জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রার্থিতার বিষয়ে সমর্থন যাচাই করছেন। জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালনরত নুসেইবেহ চলতি সপ্তাহেই মহাসচিব পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করতে পারেন।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৬ সালের শেষে দায়িত্ব ছাড়বেন। পাঁচ বছর মেয়াদি দুটি মেয়াদে তার দায়িত্বকাল প্রথমে করোনাভাইরাস মহামারি, পরে যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আর তাই তার উত্তরসূরিকে কার্যত একটি সংকটাপন্ন সংস্থার দায়িত্ব নিতে হবে।

জাতিসংঘ এখন তীব্র বাজেট সংকটে রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে সংস্থাটির কর্তৃত্বও ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর চাপও দিচ্ছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস বলছে, জাতিসংঘের ভেতরে ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছয় মাস ধরে প্রকাশ্য প্রচার-প্রচারণা চালানোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত শীর্ষ তিন প্রার্থী এখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সবার সমর্থন আদায়ে লড়াই করছেন। এই পাঁচটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—প্রত্যেকেই জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান। গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটে তিনি ৯টি ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ ভোট পেয়েছেন। চূড়ান্ত ভোটে এই সমর্থন মহাসচিব পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি দেশের কাছ থেকে তিনি ‘অসমর্থন’ ভোটও পেয়েছেন।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও দুটি ‘অসমর্থন’ ভোট পেয়েছেন।

এমন অবস্থায় নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা প্রায় অচলাবস্থায় পৌঁছানোয় শেষ মুহূর্তে নতুন প্রার্থীদের নাম বিবেচনায় আসছে বলে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ও অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আর সম্ভাব্য নতুন প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছেন লানা নুসেইবেহ। তবে শুধু আলোচিতই নয়, কূটনীতিকদের মতে, আমিরাতের এই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সবচেয়ে বিতর্কিত প্রার্থীও হতে পারেন।

ফিনান্সিয়াল টাইমস বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে লানা নুসেইবেহ সংস্থাটিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দক্ষ কূটনীতিক আমিরাতের নীতি তুলে ধরেছেন এবং দেশটির কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ সময়ে বিনিয়োগকারী ও ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমিরাতের ভূমিকা ক্রমেই জোরালো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনায় আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরা নুসেইবেহর জন্য কঠিন হতে পারে বলে কূটনীতিকেরা মনে করছেন।

বিশেষ করে সুদানে আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। দেশটির গৃহযুদ্ধে আধাসামরিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সমর্থন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে আমিরাতের বিরুদ্ধে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে আবুধাবি যুদ্ধরত কোনো পক্ষকেই অস্ত্র দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নুসেইবেহর প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হতে পারে, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব তার বিরোধিতা করবে কি না। আঞ্চলিক কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা, রিয়াদ লানা নুসেইবেহর প্রার্থিতায় আপত্তি নাও জানাতে পারে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে থাকা সৌদি আরব ইয়েমেন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আবুধাবির সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছে।

তবে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরো বলেছেন, আমিরাতের কোনো নাগরিক জাতিসংঘের মহাসচিব হলে তা রিয়াদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

কাফিয়েরোর ভাষায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দুই শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে এবং বৃহত্তর অঞ্চলে তাদের স্বার্থ ও লক্ষ্যও আলাদা। তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব নুসেইবেহর প্রার্থিতার সক্রিয় বিরোধিতা করবেই। তবে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেখানে এক পক্ষের লাভকে অন্য পক্ষের ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।

চলতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি সমঝোতা হয়েছিল যে এবার মহাসচিবের পদটি লাতিন আমেরিকার কোনো প্রতিনিধির পাওয়া উচিত। পাশাপাশি টানা ৯ জন পুরুষ মহাসচিবের পর এবার একজন নারীকে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রকাশ্যে অঞ্চল ও লিঙ্গের বিষয় দুটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখাচ্ছে।

গত সপ্তাহের ভোটের পর জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, আঞ্চলিক পালাবদলের বিষয়ে একটি প্রত্যাশা রয়েছে। অবশ্য সেরা প্রার্থী যদি নারী হন, তাহলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। তবে আমাদের প্রয়োজন সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী।’

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড গওয়ান বলেন, ‘নিজেদের অঞ্চলের কাউকে মহাসচিব করতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে। তবে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো বিষয়টিকে গুরুত্ব না-ও দিতে পারে।’

জাতিসংঘের কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন তুরস্কের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থার প্রধান ফেরিদুন সিনিরলিওলু। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকার অন্তত আরও দুই কর্মকর্তা নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়ে সমর্থন যাচাই করছেন।

গ্রিনস্প্যানের সমর্থকেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ছয় দফা ভোটের মধ্যে পাঁচটিতেই তিনি জয়ী হয়েছেন। জাতিসংঘে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে একমাত্র তারই। জাতিসংঘের নির্বাচনপ্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণকারীদের মতে, তার বিরুদ্ধে আসা দুটি ‘অসমর্থন’ ভোট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলো নিয়োগ ও অগ্রাধিকারের বিষয়ে তার কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা হিসেবেও এই ‘অসমর্থন’ ভোট দেয়া হয়ে থাকতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় এ ধরনের দর-কষাকষি নতুন নয়।

১৯৯৬ সালে মহাসচিব নির্বাচনের দৌড়ে শেষ পর্যায় পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একজনের ‘অসমর্থন’ ভোটের মুখে ছিলেন কফি আনান। শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর পেছনে একটি কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখেছিল, যিনি খুব বেশি প্রচারবিমুখ এবং বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করবেন না।

জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ডেভিড স্টিভেন বলেছেন, বর্তমান প্রার্থীদের নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে নতুন প্রার্থীদের যোগ দেয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি বলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর একটি হলো— নতুন কোনো প্রার্থী সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য কোনো কর্মকর্তাই মহাসচিব হতে পারেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন সংস্কারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে এমন প্রার্থী চাইছে, তখন এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

স্টিভেন বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। তার ভাষায়, ‘১৫ সদস্য দেশের একটি পরিষদের সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগা হাস্যকর। নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেয়ার আগে প্রস্তুতির জন্য যে সময় পাবেন, তা হবে উত্তরসূরি বাছাই করতে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যয় করা সময়ের চেয়েও কম।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৬:১২:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
০

জাতিসংঘের মহাসচিব পদে হঠাৎ আলোচনায় লানা নুসেইবেহ

আপডেট: ০৬:১২:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লানা নুসেইবেহ। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হওয়ার কথা। তবে উত্তরসূরি নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমর্থন নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে প্রতিযোগিতা জটিল হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে নুসেইবেহর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা।

প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে। কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুসেইবেহর সমর্থকেরা জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রার্থিতার বিষয়ে সমর্থন যাচাই করছেন। জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালনরত নুসেইবেহ চলতি সপ্তাহেই মহাসচিব পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করতে পারেন।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৬ সালের শেষে দায়িত্ব ছাড়বেন। পাঁচ বছর মেয়াদি দুটি মেয়াদে তার দায়িত্বকাল প্রথমে করোনাভাইরাস মহামারি, পরে যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আর তাই তার উত্তরসূরিকে কার্যত একটি সংকটাপন্ন সংস্থার দায়িত্ব নিতে হবে।

জাতিসংঘ এখন তীব্র বাজেট সংকটে রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে সংস্থাটির কর্তৃত্বও ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর চাপও দিচ্ছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমস বলছে, জাতিসংঘের ভেতরে ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছয় মাস ধরে প্রকাশ্য প্রচার-প্রচারণা চালানোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত শীর্ষ তিন প্রার্থী এখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সবার সমর্থন আদায়ে লড়াই করছেন। এই পাঁচটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—প্রত্যেকেই জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান। গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটে তিনি ৯টি ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ ভোট পেয়েছেন। চূড়ান্ত ভোটে এই সমর্থন মহাসচিব পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি দেশের কাছ থেকে তিনি ‘অসমর্থন’ ভোটও পেয়েছেন।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও দুটি ‘অসমর্থন’ ভোট পেয়েছেন।

এমন অবস্থায় নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা প্রায় অচলাবস্থায় পৌঁছানোয় শেষ মুহূর্তে নতুন প্রার্থীদের নাম বিবেচনায় আসছে বলে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ও অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আর সম্ভাব্য নতুন প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছেন লানা নুসেইবেহ। তবে শুধু আলোচিতই নয়, কূটনীতিকদের মতে, আমিরাতের এই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সবচেয়ে বিতর্কিত প্রার্থীও হতে পারেন।

ফিনান্সিয়াল টাইমস বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে লানা নুসেইবেহ সংস্থাটিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দক্ষ কূটনীতিক আমিরাতের নীতি তুলে ধরেছেন এবং দেশটির কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ সময়ে বিনিয়োগকারী ও ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমিরাতের ভূমিকা ক্রমেই জোরালো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনায় আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরা নুসেইবেহর জন্য কঠিন হতে পারে বলে কূটনীতিকেরা মনে করছেন।

বিশেষ করে সুদানে আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। দেশটির গৃহযুদ্ধে আধাসামরিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সমর্থন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে আমিরাতের বিরুদ্ধে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে আবুধাবি যুদ্ধরত কোনো পক্ষকেই অস্ত্র দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নুসেইবেহর প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হতে পারে, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব তার বিরোধিতা করবে কি না। আঞ্চলিক কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা, রিয়াদ লানা নুসেইবেহর প্রার্থিতায় আপত্তি নাও জানাতে পারে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে থাকা সৌদি আরব ইয়েমেন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আবুধাবির সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছে।

তবে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরো বলেছেন, আমিরাতের কোনো নাগরিক জাতিসংঘের মহাসচিব হলে তা রিয়াদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

কাফিয়েরোর ভাষায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দুই শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে এবং বৃহত্তর অঞ্চলে তাদের স্বার্থ ও লক্ষ্যও আলাদা। তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব নুসেইবেহর প্রার্থিতার সক্রিয় বিরোধিতা করবেই। তবে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেখানে এক পক্ষের লাভকে অন্য পক্ষের ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।

চলতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি সমঝোতা হয়েছিল যে এবার মহাসচিবের পদটি লাতিন আমেরিকার কোনো প্রতিনিধির পাওয়া উচিত। পাশাপাশি টানা ৯ জন পুরুষ মহাসচিবের পর এবার একজন নারীকে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রকাশ্যে অঞ্চল ও লিঙ্গের বিষয় দুটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখাচ্ছে।

গত সপ্তাহের ভোটের পর জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, আঞ্চলিক পালাবদলের বিষয়ে একটি প্রত্যাশা রয়েছে। অবশ্য সেরা প্রার্থী যদি নারী হন, তাহলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। তবে আমাদের প্রয়োজন সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী।’

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড গওয়ান বলেন, ‘নিজেদের অঞ্চলের কাউকে মহাসচিব করতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে। তবে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো বিষয়টিকে গুরুত্ব না-ও দিতে পারে।’

জাতিসংঘের কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন তুরস্কের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থার প্রধান ফেরিদুন সিনিরলিওলু। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকার অন্তত আরও দুই কর্মকর্তা নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়ে সমর্থন যাচাই করছেন।

গ্রিনস্প্যানের সমর্থকেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ছয় দফা ভোটের মধ্যে পাঁচটিতেই তিনি জয়ী হয়েছেন। জাতিসংঘে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে একমাত্র তারই। জাতিসংঘের নির্বাচনপ্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণকারীদের মতে, তার বিরুদ্ধে আসা দুটি ‘অসমর্থন’ ভোট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলো নিয়োগ ও অগ্রাধিকারের বিষয়ে তার কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা হিসেবেও এই ‘অসমর্থন’ ভোট দেয়া হয়ে থাকতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় এ ধরনের দর-কষাকষি নতুন নয়।

১৯৯৬ সালে মহাসচিব নির্বাচনের দৌড়ে শেষ পর্যায় পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একজনের ‘অসমর্থন’ ভোটের মুখে ছিলেন কফি আনান। শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর পেছনে একটি কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখেছিল, যিনি খুব বেশি প্রচারবিমুখ এবং বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করবেন না।

জাতিসংঘ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ডেভিড স্টিভেন বলেছেন, বর্তমান প্রার্থীদের নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে নতুন প্রার্থীদের যোগ দেয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি বলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর একটি হলো— নতুন কোনো প্রার্থী সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য কোনো কর্মকর্তাই মহাসচিব হতে পারেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন সংস্কারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে এমন প্রার্থী চাইছে, তখন এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

স্টিভেন বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। তার ভাষায়, ‘১৫ সদস্য দেশের একটি পরিষদের সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগা হাস্যকর। নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেয়ার আগে প্রস্তুতির জন্য যে সময় পাবেন, তা হবে উত্তরসূরি বাছাই করতে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যয় করা সময়ের চেয়েও কম।