০৯:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

তাওহীদের ডাবল সেঞ্চুরি

মিরপুরে সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হয়েছিলেন, সিলেটে ব্যাট হাতেই দিলেন তার জবাব। শুধু সমালোচনার জবাব দেওয়াই নয়, একপ্রান্ত আগলে রেখে দলকে টেনে তুললেন খাদের কিনারা থেকে। সতীর্থরা যখন একের পর এক ফিরে যাচ্ছিলেন সাজঘরে, তখন বুক চিতিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন তাওহীদ হৃদয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গড়েছেন রানের পাহাড়। প্রথমে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, এরপর সেটিকে রূপ দিলেন মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরিতে। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিকও এখন তিনি।

জোমেল ওয়ারিক্যানের করা ১০০তম ওভারের প্রথম বলে এক রান নিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হৃদয়। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরি। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। তবে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি এখন হৃদয়ের দখলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকের করা অপরাজিত ২১৯ রানকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

৩০৪ বলে ১৯ চার ও ৭ ছক্কায় ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করেন হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশের ইনিংস যখন ধুঁকছিল, তখন একাই যেন হয়ে ওঠেন দলের ত্রাতা। কখনো মুশফিকুর রহিম, কখনো মেহেদী হাসান মিরাজ, আবার কখনো তাইজুল ইসলাম, সঙ্গী বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি হৃদয়ের লড়াই। এক প্রান্তে উইকেটের পতন, অন্য প্রান্তে অবিচল হৃদয়। প্রয়োজন অনুযায়ী দেখেশুনে খেলেছেন, আবার সুযোগ পেলেই চড়াও হয়েছেন বোলারদের ওপর।

অথচ এই হৃদয়ই মিরপুর টেস্টের পর ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রে। দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন তার টেস্ট ব্যাটিংয়ের সামর্থ্য। প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৪২ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে ফিরেছিলেন শূন্য হাতে। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাকের পর তাকে নিয়ে ক্রিকেট মহলে শুরু হয়েছিল নানা আলোচনা। সেই সমালোচনাকেই যেন জেদে পরিণত করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটার। সিলেটে ব্যাট হাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে লড়াই করার সামর্থ্য তার আছে।

তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে। হৃদয় ২৯ ও মুশফিক ১৯ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামেন। দিনের শুরুতে দুজনের ব্যাটে আশার আলো দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ৩৪ রান করে মুশফিক ফিরলে ভাঙে তাদের ৭৩ রানের জুটি। এরপর ক্রিজে এসে দুটি চার মেরে ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন লিটন দাস। তবে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনিও। ওয়ারিক্যানের দ্বিতীয় শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন লিটন। ১৩৮ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

এরপর মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন হৃদয়। ষষ্ঠ উইকেটে দুজন যোগ করেন ৪১ রান। কিন্তু রোস্টন চেজের বলে জাস্টিন গ্রিভসের দুর্দান্ত ক্যাচে মিরাজ ফিরলে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। একসময় ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে ২০০ রান পার করাও কঠিন মনে হচ্ছিল।

সেখান থেকেই শুরু হৃদয়ের অবিশ্বাস্য লড়াই। অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে নিয়ে গড়েন প্রতিরোধের দেয়াল। দুজনের ১৬৭ বলে ১১৭ রানের জুটি বাংলাদেশকে শুধু বিপর্যয় থেকেই উদ্ধার করেনি, ম্যাচে ফিরিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও। এই জুটিতে তাইজুল ছিলেন যোগ্য সঙ্গী, আর হৃদয় ছিলেন লড়াইয়ের অগ্রনায়ক।

এর আগে ৫১ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর চতুর্থ উইকেটে মুশফিকের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়েছিলেন হৃদয়। এরপর মিরাজের সঙ্গে ৪১ রান যোগ করেন। আর তাইজুলের সঙ্গে তার জুটি হয়ে ওঠে ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শামার জোসেফের করা ৮৪তম ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মেরে দেড় শ রান পূর্ণ করেছিলেন হৃদয়। তখনই তার ব্যাটে বড় কিছুর আভাস মিলেছিল। সেই ইনিংসে ছিল ১৪টি চার ও ৫টি ছক্কা। সেঞ্চুরির পর দেড় শ, এরপর দুই শ! প্রতিটি মাইলফলক পেরিয়ে হৃদয় লিখেছেন নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।

মিরপুরের হতাশা থেকে সিলেটের মহাকাব্য, তাওহীদ হৃদয়ের এই ইনিংস তাই কেবল একটি ডাবল সেঞ্চুরি নয়, এটি সমালোচনার জবাব, কঠিন সময়ের সাহস এবং একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই করে যাওয়ার অনন্য গল্প। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্যেরও নতুন করে জানান দিলেন তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৬:৩৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
১

তাওহীদের ডাবল সেঞ্চুরি

আপডেট: ০৬:৩৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

মিরপুরে সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হয়েছিলেন, সিলেটে ব্যাট হাতেই দিলেন তার জবাব। শুধু সমালোচনার জবাব দেওয়াই নয়, একপ্রান্ত আগলে রেখে দলকে টেনে তুললেন খাদের কিনারা থেকে। সতীর্থরা যখন একের পর এক ফিরে যাচ্ছিলেন সাজঘরে, তখন বুক চিতিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন তাওহীদ হৃদয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গড়েছেন রানের পাহাড়। প্রথমে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, এরপর সেটিকে রূপ দিলেন মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরিতে। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিকও এখন তিনি।

জোমেল ওয়ারিক্যানের করা ১০০তম ওভারের প্রথম বলে এক রান নিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হৃদয়। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরি। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। তবে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি এখন হৃদয়ের দখলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকের করা অপরাজিত ২১৯ রানকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

৩০৪ বলে ১৯ চার ও ৭ ছক্কায় ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করেন হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশের ইনিংস যখন ধুঁকছিল, তখন একাই যেন হয়ে ওঠেন দলের ত্রাতা। কখনো মুশফিকুর রহিম, কখনো মেহেদী হাসান মিরাজ, আবার কখনো তাইজুল ইসলাম, সঙ্গী বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি হৃদয়ের লড়াই। এক প্রান্তে উইকেটের পতন, অন্য প্রান্তে অবিচল হৃদয়। প্রয়োজন অনুযায়ী দেখেশুনে খেলেছেন, আবার সুযোগ পেলেই চড়াও হয়েছেন বোলারদের ওপর।

অথচ এই হৃদয়ই মিরপুর টেস্টের পর ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রে। দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন তার টেস্ট ব্যাটিংয়ের সামর্থ্য। প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৪২ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে ফিরেছিলেন শূন্য হাতে। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাকের পর তাকে নিয়ে ক্রিকেট মহলে শুরু হয়েছিল নানা আলোচনা। সেই সমালোচনাকেই যেন জেদে পরিণত করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটার। সিলেটে ব্যাট হাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে লড়াই করার সামর্থ্য তার আছে।

তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে। হৃদয় ২৯ ও মুশফিক ১৯ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামেন। দিনের শুরুতে দুজনের ব্যাটে আশার আলো দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ৩৪ রান করে মুশফিক ফিরলে ভাঙে তাদের ৭৩ রানের জুটি। এরপর ক্রিজে এসে দুটি চার মেরে ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন লিটন দাস। তবে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনিও। ওয়ারিক্যানের দ্বিতীয় শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন লিটন। ১৩৮ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

এরপর মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন হৃদয়। ষষ্ঠ উইকেটে দুজন যোগ করেন ৪১ রান। কিন্তু রোস্টন চেজের বলে জাস্টিন গ্রিভসের দুর্দান্ত ক্যাচে মিরাজ ফিরলে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। একসময় ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে ২০০ রান পার করাও কঠিন মনে হচ্ছিল।

সেখান থেকেই শুরু হৃদয়ের অবিশ্বাস্য লড়াই। অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে নিয়ে গড়েন প্রতিরোধের দেয়াল। দুজনের ১৬৭ বলে ১১৭ রানের জুটি বাংলাদেশকে শুধু বিপর্যয় থেকেই উদ্ধার করেনি, ম্যাচে ফিরিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও। এই জুটিতে তাইজুল ছিলেন যোগ্য সঙ্গী, আর হৃদয় ছিলেন লড়াইয়ের অগ্রনায়ক।

এর আগে ৫১ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর চতুর্থ উইকেটে মুশফিকের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়েছিলেন হৃদয়। এরপর মিরাজের সঙ্গে ৪১ রান যোগ করেন। আর তাইজুলের সঙ্গে তার জুটি হয়ে ওঠে ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শামার জোসেফের করা ৮৪তম ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মেরে দেড় শ রান পূর্ণ করেছিলেন হৃদয়। তখনই তার ব্যাটে বড় কিছুর আভাস মিলেছিল। সেই ইনিংসে ছিল ১৪টি চার ও ৫টি ছক্কা। সেঞ্চুরির পর দেড় শ, এরপর দুই শ! প্রতিটি মাইলফলক পেরিয়ে হৃদয় লিখেছেন নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।

মিরপুরের হতাশা থেকে সিলেটের মহাকাব্য, তাওহীদ হৃদয়ের এই ইনিংস তাই কেবল একটি ডাবল সেঞ্চুরি নয়, এটি সমালোচনার জবাব, কঠিন সময়ের সাহস এবং একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই করে যাওয়ার অনন্য গল্প। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্যেরও নতুন করে জানান দিলেন তিনি।