১১:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পৃথিবী, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত গলছে পৃথিবীর হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফ। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে বহু অঞ্চলের হিমবাহের অধিকাংশ বরফ হারিয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত মাটির প্রায় সবটাই গলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

আন্তর্জাতিক ক্রায়োস্ফিয়ার ক্লাইমেট ইনিশিয়েটিভ (আইসিসিআই) ও জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে ৮০ জন বিজ্ঞানীর তৈরি এক প্রতিবেদনে এসব সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুষার ও বরফের স্থায়ী ক্ষয় প্রমাণ করে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে উষ্ণতা ২ বা ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছালেও পরিস্থিতি সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব—এমন ধারণা ভুল। বরং বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।

প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং প্রকৃতি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে শতাব্দীর শেষ নাগাদ উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, কোনো একপর্যায়ে এ সীমা অতিক্রম করা প্রায় অনিবার্য হলেও তা যেন যতটা সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্য হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা প্রায় সব পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত মাটি গলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের পানির প্রবাহব্যবস্থায় গুরুতর, এমনকি আকস্মিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। বাড়তে পারে সমুদ্রের অম্লতাও।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের বরফ আগের ধারণার তুলনায় অনেক ধীরে পুনরুদ্ধার হয়। ফলে তাপমাত্রা পরে কমিয়ে আনলেও বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলগুলোর ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, পারমাফ্রস্ট গলে বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি তাপ আটকে রাখা গ্যাস নির্গত হতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

আইসিসিআইয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক জেমস কার্কহাম বলেন, জলবায়ুব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো ক্রায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর তুষার ও বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল। এসব অঞ্চলের ক্ষতির পরিণতি শুধু মেরু অঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো পৃথিবীকে প্রভাবিত করবে।

তিনি বলেন, চলতি বছর নেপাল-চীন সীমান্তে বরফ ও পাথরের ভয়াবহ ধসের ঘটনা ঘটেছে, যা এ ধরনের সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং একটি ঘটনায় নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের বরফের ২০ শতাংশ হারিয়ে গেছে। আগামী এক দশকে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তুরস্কে ৩১তম বার্ষিক কপ জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতা ও কূটনীতিকদের সমাগমের প্রাক্কালে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল ও মেরু সাগরে দ্রুততর বরফ গলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে ০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনা গেলেও কয়েক শতাব্দীর মধ্যে হিমবাহগুলোর বর্তমান আয়তনের মাত্র ৭০ শতাংশ টিকে থাকতে পারে। কারণ, অতীতের উষ্ণতার প্রভাবে হিমবাহগুলো আরও দীর্ঘ সময় ধরে গলতে থাকবে।

গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর বর্তমানে ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দ্রুত গলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা সাময়িকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও পরে তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা হলে এসব বরফস্তরের গলন অব্যাহত থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মেরু অঞ্চলের বরফস্তর টিকিয়ে রাখার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ উষ্ণতার সীমা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের খুব কাছাকাছি, এমনকি এর চেয়েও কম হতে পারে।

কার্কহাম বলেন, উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রতিটি ভগ্নাংশের প্রতিই তুষার ও বরফ দ্রুত সাড়া দেয়। কিন্তু তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এসব ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে শতাব্দী, এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে এমন কোনো সীমা অতিক্রম করলে, যার পর পরিবর্তন কার্যত অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

গত মাসে প্রকাশিত ইউএনইপির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার ভালো সম্ভাবনা তৈরি করতে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে ভালো কোনো ফলাফল পাওয়া যাবে না।

নতুন ক্রায়োস্ফিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতিমালা অনুসরণ করা হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে রকি পর্বতমালা, আল্পস, আইসল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমবাহের বরফের পরিমাণ বর্তমানের ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে, উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে এসব অঞ্চলের হিমবাহের বরফের প্রায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ টিকে থাকতে পারে।

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের পানির উৎস এ অঞ্চলের হিমবাহ। বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে এখানকার হিমবাহের বরফের মাত্র ৪১ শতাংশ অবশিষ্ট থাকতে পারে। তবে উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে বরফের প্রায় ৮৩ শতাংশ টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহের বরফ হারিয়ে যাওয়ার ফলে পানির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের মানুষ পানীয় জল, কৃষি ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমবাহনির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল, তারা দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না- এমন জলবায়ুবিজ্ঞানী ও নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, তিন দশক আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দ্রুত বরফস্তর গলছে। সমুদ্রের বরফ ও পাহাড়ি হিমবাহ রেকর্ড গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মেরু সাগরের পানির অম্লতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব পরিবর্তন মানবসময়ের পরিসরে ইতোমধ্যে অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠেছে এবং এর পরিণতি বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে।

হেয়ার আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ দুর্বল করতে যেসব সরকারি নীতিনির্ধারক ও জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের নির্বাহী ভূমিকা রেখেছেন, তাদের এ প্রতিবেদন থেকে নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতি উপলব্ধি করা উচিত। তার মতে, এসব সিদ্ধান্ত পৃথিবীর পরিবেশের মৌলিক ক্ষতি করেছে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা হলো, বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও তা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা এবং দীর্ঘ মেয়াদে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ ডিগ্রির নিচে নামানোর লক্ষ্য নিতে হবে। এ জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের উদ্যোগও জোরদার করা জরুরি। সূত্র: গার্ডিয়ান

 

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৮:৩৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
২

ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পৃথিবী, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

আপডেট: ০৮:৩৬:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত গলছে পৃথিবীর হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফ। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে বহু অঞ্চলের হিমবাহের অধিকাংশ বরফ হারিয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত মাটির প্রায় সবটাই গলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

আন্তর্জাতিক ক্রায়োস্ফিয়ার ক্লাইমেট ইনিশিয়েটিভ (আইসিসিআই) ও জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে ৮০ জন বিজ্ঞানীর তৈরি এক প্রতিবেদনে এসব সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুষার ও বরফের স্থায়ী ক্ষয় প্রমাণ করে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে উষ্ণতা ২ বা ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছালেও পরিস্থিতি সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব—এমন ধারণা ভুল। বরং বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।

প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং প্রকৃতি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে শতাব্দীর শেষ নাগাদ উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, কোনো একপর্যায়ে এ সীমা অতিক্রম করা প্রায় অনিবার্য হলেও তা যেন যতটা সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্য হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা প্রায় সব পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত মাটি গলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের পানির প্রবাহব্যবস্থায় গুরুতর, এমনকি আকস্মিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। বাড়তে পারে সমুদ্রের অম্লতাও।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের বরফ আগের ধারণার তুলনায় অনেক ধীরে পুনরুদ্ধার হয়। ফলে তাপমাত্রা পরে কমিয়ে আনলেও বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলগুলোর ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, পারমাফ্রস্ট গলে বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি তাপ আটকে রাখা গ্যাস নির্গত হতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

আইসিসিআইয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক জেমস কার্কহাম বলেন, জলবায়ুব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো ক্রায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর তুষার ও বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল। এসব অঞ্চলের ক্ষতির পরিণতি শুধু মেরু অঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো পৃথিবীকে প্রভাবিত করবে।

তিনি বলেন, চলতি বছর নেপাল-চীন সীমান্তে বরফ ও পাথরের ভয়াবহ ধসের ঘটনা ঘটেছে, যা এ ধরনের সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং একটি ঘটনায় নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের বরফের ২০ শতাংশ হারিয়ে গেছে। আগামী এক দশকে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তুরস্কে ৩১তম বার্ষিক কপ জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতা ও কূটনীতিকদের সমাগমের প্রাক্কালে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল ও মেরু সাগরে দ্রুততর বরফ গলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে ০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনা গেলেও কয়েক শতাব্দীর মধ্যে হিমবাহগুলোর বর্তমান আয়তনের মাত্র ৭০ শতাংশ টিকে থাকতে পারে। কারণ, অতীতের উষ্ণতার প্রভাবে হিমবাহগুলো আরও দীর্ঘ সময় ধরে গলতে থাকবে।

গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর বর্তমানে ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দ্রুত গলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা সাময়িকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও পরে তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা হলে এসব বরফস্তরের গলন অব্যাহত থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মেরু অঞ্চলের বরফস্তর টিকিয়ে রাখার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ উষ্ণতার সীমা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের খুব কাছাকাছি, এমনকি এর চেয়েও কম হতে পারে।

কার্কহাম বলেন, উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রতিটি ভগ্নাংশের প্রতিই তুষার ও বরফ দ্রুত সাড়া দেয়। কিন্তু তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এসব ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে শতাব্দী, এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে এমন কোনো সীমা অতিক্রম করলে, যার পর পরিবর্তন কার্যত অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

গত মাসে প্রকাশিত ইউএনইপির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার ভালো সম্ভাবনা তৈরি করতে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে ভালো কোনো ফলাফল পাওয়া যাবে না।

নতুন ক্রায়োস্ফিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতিমালা অনুসরণ করা হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে রকি পর্বতমালা, আল্পস, আইসল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমবাহের বরফের পরিমাণ বর্তমানের ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে, উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে এসব অঞ্চলের হিমবাহের বরফের প্রায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ টিকে থাকতে পারে।

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের পানির উৎস এ অঞ্চলের হিমবাহ। বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে এখানকার হিমবাহের বরফের মাত্র ৪১ শতাংশ অবশিষ্ট থাকতে পারে। তবে উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে বরফের প্রায় ৮৩ শতাংশ টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহের বরফ হারিয়ে যাওয়ার ফলে পানির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের মানুষ পানীয় জল, কৃষি ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমবাহনির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল, তারা দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না- এমন জলবায়ুবিজ্ঞানী ও নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, তিন দশক আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দ্রুত বরফস্তর গলছে। সমুদ্রের বরফ ও পাহাড়ি হিমবাহ রেকর্ড গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মেরু সাগরের পানির অম্লতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব পরিবর্তন মানবসময়ের পরিসরে ইতোমধ্যে অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠেছে এবং এর পরিণতি বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে।

হেয়ার আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ দুর্বল করতে যেসব সরকারি নীতিনির্ধারক ও জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের নির্বাহী ভূমিকা রেখেছেন, তাদের এ প্রতিবেদন থেকে নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতি উপলব্ধি করা উচিত। তার মতে, এসব সিদ্ধান্ত পৃথিবীর পরিবেশের মৌলিক ক্ষতি করেছে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা হলো, বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও তা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা এবং দীর্ঘ মেয়াদে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ১ ডিগ্রির নিচে নামানোর লক্ষ্য নিতে হবে। এ জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের উদ্যোগও জোরদার করা জরুরি। সূত্র: গার্ডিয়ান