ইয়েমেনে হুতিদের এলাকায় ব্যাপক হামলা, নিহত ৭০০
ইয়েমেনে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের লড়াই। ইয়েমেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রাজধানী সানা ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশটির বিভিন্ন এলাকায় শত শত হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৭০০ হুতি বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে সেনাবাহিনী।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে তাইজ শহর ও এর আশপাশের এলাকায়। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কপথ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি শনিবার (৩ অক্টোবর) বলেন, হুতিদের অবস্থান, চলাচল ও সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে সেনাবাহিনী ‘২৫৭টি নির্ভুল হামলা’ চালিয়েছে। তিনি এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, এসব হামলায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।
আল-নাজিলি বলেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এসব অভিযানে অন্তত ৭০০ হুতি বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামরিক স্থাপনা’ ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি যুদ্ধযান ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে।
তবে সরকারি বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি সেনাবাহিনীর এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, এসব হামলায় হুতিদের ‘যুদ্ধ সক্ষমতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নিজেদের বাড়িঘর ও গ্রামে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়েছে’।
আল-নাজিলি জানান, শনিবারের অভিযানগুলো সানা, মিদি, বাকিম এবং আল-জাওফ, মারিব, আল-বাইদা ও লাহিজের বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে চালানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক তৎপরতা ছিল তাইজকে ঘিরে।
এর আগে গত শুক্রবার আল-নাজিলি জানিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী প্রায় ৫০০টি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এতে ১ হাজার ৫৪০ হুতি বিদ্রোহী নিহত বা আহত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
আল জাজিরা বলছে, সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা তাইজ শহর নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শনিবার তাইজ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাহা আলী জানান, শহরটির আশপাশের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘর্ষ ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
এর মধ্যে শহরের পশ্চিম প্রান্তে সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে। তিনি জানান, হামলায় হুতিরা অস্বাভাবিক মাত্রায় গোলাবর্ষণ করছে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলো লক্ষ্য করে হুতিদের দিক থেকে ছোড়া গোলার শব্দ এখনও শোনা যাচ্ছে।
গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বলে জানান মাহা আলী। তিনি বলেন, লড়াইয়ে বেসামরিক মানুষও হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ধুবাবের একটি আবাসিক এলাকায় ছোড়া একটি গোলার আঘাতে এক শিশু নিহত হয়েছে। গোলার টুকরার আঘাতেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
মাহা আলী জানান, সামা ফ্রন্টে গত শুক্রবার পাহাড়ি এলাকায় অগ্রসর হয় হুতিরা। সেখানে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র লড়াই এখনও চলছে। মাঠপর্যায়ের কয়েকটি সূত্র তাকে জানিয়েছে, সামা এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা চলে গেছেন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।
এদিকে এই সংঘর্ষের পর তাইজ শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সামা দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।
সাবাকে এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, সামা জেলার স্থানীয় সশস্ত্র প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সহায়তায় সরকারি বাহিনী ‘তীব্র লড়াইয়ের’ পর দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে কয়েক ডজন হুতি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছে এবং অন্যরা পালিয়ে গেছে।
এদিকে শনিবার সেনাবাহিনীর গণমাধ্যমবিষয়ক কর্মকর্তা আম্মার আল-সামিই আল জাজিরাকে জানান, তাইজের আল-হুবান সড়কপথটি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
তিনি বলেন, এর আগে ৯ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালে ‘মানবিক কারণে’ বেসামরিকদের জন্য পথটি খুলে দেয়া হয়েছিল। ইয়েমেনে বিরোধী পক্ষগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। এই সড়ক হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-হুবানকে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা তাইজ শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আল-সামিই বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণেই পথটি বন্ধ করা হয়েছে। এই সড়ক ব্যবহার করে হুতিরা তাইজে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি ওই এলাকার আশপাশে হামলা এবং সামগ্রিকভাবে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর কারণেও এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
২০২২ সালে ইয়েমেন সরকার ও হুতিদের মধ্যে হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলতি বছরের জুলাইয়ে ভেঙে যায়। এরপর থেকে দেশটিতে লড়াই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা পশ্চিম ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দ্বীপ এবং বন্দরনগরী মোকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এরপর থেকে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলো বেশিরভাগ যুদ্ধফ্রন্টের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। লড়াই নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী ছেড়ে এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়।
























