ধ্বংসাত্মক অস্ত্র উদ্ভাবনের পথে চীন
পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি ৬০ টন ওজনের ট্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি নকশা নিয়ে গবেষণা করেছেন চীনের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। এতে ৫০ মেগাজুল শক্তির একটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেলগান ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০৪৫ সালের পর পর্যন্ত এই প্রযুক্তি উন্নয়নের সম্ভাব্য পথ নিয়ে চালানো হয়েছে গবেষণা। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন।
চীনের প্রতিরক্ষা বিষয়ক জার্নাল ‘অ্যাক্টা আর্মামেন্টারি’র ২০২৬ সালের জুন মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি করেছে ইনার মঙ্গোলিয়া ফার্স্ট মেশিনারি গ্রুপ, স্টেট কি ল্যাবরেটরি অব স্পেশাল ভেহিকেল ডিজাইন অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টিগ্রেশন টেকনোলজি এবং বেইজিং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা। ইনার মঙ্গোলিয়া ফার্স্ট মেশিনারি গ্রুপ চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি প্রতিষ্ঠান। সাঁজোয়া যান তৈরি ও উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির বড় ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। গবেষকেরা এই ট্যাংক তৈরির জন্য তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা দিয়েছেন।
প্রথম ধাপে প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিন
প্রথম ধাপে, ২০৩৫ সালের আগে, বর্তমানে ব্যবহৃত সাঁজোয়া যানগুলোর প্ল্যাটফর্মে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিনই থাকবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ারের একটি ডিজেল জেনারেটরের সঙ্গে সুপারক্যাপাসিটর ও ফ্লাইহুইল শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে।
ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক বিপুল শক্তি সরবরাহ করতেই রাখা হবে এই ব্যবস্থা। প্রথম প্রজন্মের এই ব্যবস্থায় ১০ মেগাজুল শক্তির একটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক গান রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। গবেষকেরা এই অস্ত্রের সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার হতে পারে বলে ধারণা করেছেন।
প্রথম ধাপের ট্যাংকে প্রায় ২ মেগাজুল শক্তি প্রয়োজন হবে এমন একটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আর্মার ব্যবস্থাও থাকবে। চূড়ান্ত নকশায় যে অত্যন্ত জটিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা ছাড়াই যাতে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হয়- সেই উদ্দেশ্যেই এই অন্তর্বর্তীকালীন নকশাটি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে বাড়বে অস্ত্রের শক্তি
দ্বিতীয় ধাপটি ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক গানের শক্তি প্রায় ২০ মেগাজুল এবং সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটারে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এ সময় ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আর্মারও আরও শক্তিশালী করা হবে।
এর জন্য প্রায় ১০ মেগাজুল শক্তির ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এই পর্যায়ে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি ডিজেল জেনারেটর বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। এর সঙ্গে প্রায় ৫ টন ওজনের উন্নত শক্তি সংরক্ষণ যন্ত্রপাতি যুক্ত থাকবে।
শেষ ধাপে পারমাণবিক শক্তি, পাল্টা ৪৫০ কি.মি.
চূড়ান্ত ধাপে ট্যাংকে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গবেষকেরা তরল ধাতু দিয়ে ঠান্ডা করা ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর ব্যবহারের কথা বলেছেন। পুরো রিঅ্যাক্টর ব্যবস্থাটি প্রায় ২ ঘনমিটার জায়গার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই রিঅ্যাক্টর থেকে ট্যাংকের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
এই পর্যায়ে প্রস্তাবিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেলগানের শক্তি হবে প্রায় ৫০ মেগাজুল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই অস্ত্রের গোলার গতি ঘণ্টায় নয়, সেকেন্ডে প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার হতে পারে এবং এর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার।
এ ধরনের অস্ত্র প্রচলিত ট্যাংকের কামানের তুলনায় অনেক বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারবে। ফলে ট্যাংকটির প্রধান অস্ত্র সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পাশাপাশি দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলার কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ ট্যাংকে বিদ্যুতের চাহিদা
গবেষণাটির মূল বিষয় হলো ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যানে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। গবেষকেরা পারমাণবিক শক্তিচালিত ট্যাংককে এখনই তৈরি করা সম্ভব এমন একটি প্রকল্প হিসেবে দেখেননি। বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শক্তি সংরক্ষণের প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্তিশালী অস্ত্র, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ধাপে ধাপে কীভাবে ট্যাংকে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছেন।
গবেষণাপত্রে সুপারক্যাপাসিটর, ফ্লাইহুইল, উন্নত ব্যাটারি, সুপারকন্ডাক্টিং স্টোরেজ এবং সমন্বিত ভেহিকেল মাইক্রোগ্রিডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতের অস্ত্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল তাৎক্ষণিক শক্তি সরবরাহে এগুলো সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
প্রযুক্তি সম্ভব হলেও খরচ নিয়ে প্রশ্ন
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, চীনের প্রতিরক্ষা খাতে বিশেষজ্ঞদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। ২০২৫ সালে চীন বিশ্বের প্রথম চতুর্থ প্রজন্মের প্রধান যুদ্ধট্যাংক টাইপ-১০০ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করেছে বলে এতে দাবি করা হয়েছে, যা অন্য দেশগুলোর তুলনায় কয়েক বছর এগিয়ে।
চীন তাদের ডেস্ট্রয়ার বা ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতায়ও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও চীন প্রায় এক দশক এগিয়ে থাকতে পারে বলে সেখানে দাবি করা হয়েছে।
তবে পারমাণবিক শক্তিচালিত ট্যাংক প্রযুক্তিগতভাবে তৈরি করা সম্ভব হলেও এর খরচের তুলনায় কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে স্থলযুদ্ধে খুব দামি ভারী সাঁজোয়া যানের বদলে এখন বিপুল সংখ্যক কম খরচের চালকবিহীন ব্যবস্থা বা ড্রোন ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এর উদাহরণ দেখা গেছে। সেখানে প্রধান যুদ্ধট্যাংকের গোলাবর্ষণ ক্ষমতার চেয়ে ড্রোনের সঙ্গে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করা, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করা এবং উন্নত সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, টাইপ-১০০ ট্যাংকে এসব সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।




















