যুদ্ধ, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি: আইএমএফ প্রধান
বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে যেমন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকি। এসব আশাবাদ ও উদ্বেগের মধ্য দিয়েই এ বছরের বার্ষিক সম্মেলন শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সম্মেলনের সমাপনী পর্বে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জর্জিয়েভা। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। সম্মেলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইএমএফ প্রধান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা এবং এশিয়ার গতিশীলতা আশাবাদের জায়গা তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে এআইয়ের প্রভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, যুদ্ধ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
জর্জিয়েভার মতে, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের দেশগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। এসব দেশের সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করা আইএমএফের দায়িত্বের অংশ।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে তেল ও গ্যাসের সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সরকারি ঋণের উচ্চ মাত্রা এবং বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি আর্থিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে পুরো সপ্তাহজুড়ে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে হতে পারে। এতে ঋণ গ্রহণের ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। মূল্যস্ফীতি, বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি এবং এআইনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল এবারের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রসঙ্গে জর্জিয়েভা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে সদস্যদেশগুলো স্বীকার করেছে। তবে প্রবৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট চালিকাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিষয়টি বোঝাতে তিনি বলেন, ‘যখন আমরা প্রবৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট চালিকাশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তখন তা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো।’
এবারের সম্মেলনে এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত মডেলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা আরোপের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম এআই এজেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা এ বিতর্ককে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্যাংককে এআই কোম্পানি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন আইএমএফ প্রধান। তার ভাষায়, ‘আমরা যখন যথাসাধ্য চেষ্টা করি, তখন তার সুফল মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।’
সব মিলিয়ে এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাবনার পাশাপাশি বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের চাপ এবং এআইয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
























